এক সময় সিঙ্গুর যে শিল্প আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, এ বার সেই সিঙ্গুরেই নতুন বিনিয়োগের পথে সবুজ সংকেত দিল রাজ্য সরকার। বুধবার নবান্নে অনুষ্ঠিত রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিঙ্গুরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ওয়্যারহাউস প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ দিন পর এই সিদ্ধান্তকে রাজ্যের শিল্প মানচিত্রে বড় মোড় হিসেবেই দেখছেন প্রশাসনিক ও শিল্প মহল।
২০০৮ সালে শিল্প বিরোধী আন্দোলনের জেরে Tata Group সিঙ্গুর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। সেই ঘটনার পর টানা কয়েক বছর এই শিল্পাঞ্চল কার্যত থমকে ছিল। রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার ১৪ বছর পর ফের সিঙ্গুরে বড় লগ্নির সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজ্যের অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে নাহার ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড। সংস্থাটিকে ৯৯ বছরের জন্য ১১.৩৫ একর জমি লিজে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের মতে, ওয়্যারহাউস প্রকল্প চালু হলে রাজ্যের ই-কমার্স ও লজিস্টিক পরিষেবায় গতি আসবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
সূত্রের খবর, এই ওয়্যারহাউস থেকে Amazon এবং Flipkart-এর মতো বড় ই-কমার্স সংস্থাগুলির পরিষেবা আরও মজবুত হতে পারে। ফলে পরিবহণ, প্যাকেজিং ও স্টোরেজের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ উপকৃত হবেন।
একই সঙ্গে রাজ্যের বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, JSW Energy Limited প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৫.৮১ টাকা দরে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি পিপিপি মডেলে ১৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নিউ সুপার ক্রিটিক্যাল থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট তৈরির কথাও রয়েছে, যদিও জমি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে রাজ্যের বিভিন্ন শিল্প পার্কেও জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হরিণঘাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ২.৭৭ একর, জঙ্গল সুন্দরী কর্মনগরীতে ১৫৫ একর, বিদ্যাসাগর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ৩০.৪২ একর এবং পানাগর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ১.৩৭ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি ডোমজুড়ের জেমস অ্যান্ড জুয়েলারি পার্কে ২০,২৬০ বর্গফুট অফিস স্পেস দেওয়া হয়েছে শিল্প সংস্থাগুলির জন্য।
এছাড়াও মন্ত্রিসভায় মাদার ডেয়ারি ক্যালকাটা এবং বাংলা ডেয়ারি-কে একত্র করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংস্থা ‘বাংলা ডেয়ারি’ নামেই পরিচিত হবে। প্রশাসনের দাবি, এই সংযুক্তিকরণের ফলে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন ও বাজার আরও বিস্তৃত হবে।
সব মিলিয়ে, সিঙ্গুরে নতুন শিল্প বিনিয়োগ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ও পরিকাঠামো উন্নয়ন—রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলি শিল্পায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

