SIR NEWS: চোখে জল, মুখে আতঙ্কের ছাপ— এমনই এক ছবি ধরা পড়ল পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দকুমার বিধানসভার বহিচবেড়িয়া পূর্ব পাড়ার এক বাড়িতে। সেখানেই থাকেন কাজল কর। বয়স এখন প্রায় চল্লিশের কোঠায়। অথচ আজও নিজের পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তার গভীর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তিনি।
১৯৯৮ সাল— সীমান্তের ওপারে তখনও অশান্ত সময়। সেই সময়ই বাংলাদেশের বরিশাল থেকে মাত্র পনেরো বছর বয়সে দালালের হাত ধরে কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতে ঢুকেছিলেন কাজল কর (তখন কাজল দাস)। সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েকজন কিশোরী, যারা আশ্রয় নিয়েছিল সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রামে। পরে কেউ চলে যায় কলকাতায়, কেউ আবার অন্য রাজ্যে।
কাজল কলকাতায় এসে কাজ নেন এক কারখানায়। সেখানেই পরিচয় হয় পূর্ব মেদিনীপুরের কার্তিক করের সঙ্গে। ২০০২ সালে তাঁদের বিয়ে হয়, এরপর স্থায়ী ঠিকানা হয় নন্দকুমারে। ২০০৩ সালে ভোটার তালিকায় নাম ওঠে কাজল করের— তখন তিনি ভেবেছিলেন, সব আশঙ্কা শেষ। কিন্তু সময় যেন আবার তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সেই পুরোনো ভয়াবহতার দিনগুলিতে।
কারণ এখন, এসআইআর -এর আতঙ্কে তাঁর ঘুম উধাও। নিজের হাতে ভোটার কার্ড, আধার, এমনকি পাসপোর্টও আছে, তবু মনে শান্তি নেই।
কাজল করের গলায় কাঁপা স্বর— “আমি তো এখানেই বিয়ে করেছি। আমার স্বামী, শ্বশুর সবাই এই দেশের মানুষ। এত বছর ধরে ভোট দিচ্ছি, আধার আছে, পাসপোর্ট আছে। তবুও যদি নাম কেটে দেয়, তাহলে যাব কোথায়?”
পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন, কাজলের বাবা-মা বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। সেই কারণেই এখন সন্দেহের তালিকায় পড়ে যেতে পারে তাঁর নাম। আরও উদ্বেগের বিষয়— ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় কাজলের নাম নেই, এমনকি তাঁর স্বামীর নামও দেখা যায়নি সেই তালিকায়। এই অবস্থায় এসআইআর যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।
আজ সকালে স্থানীয় বিএলও (Booth Level Officer) দিলীপ নারায়ণ রায় কাজল করের বাড়িতে ফর্ম বিলি করতে গেলে তিনিও বিষয়টি দেখে বিস্মিত।
তিনি জানান, “সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও যদি নাম বাদ যায়, তাহলে ব্যাপারটা গুরুতর। আমি বিষয়টি উচ্চ আধিকারিককে জানাব।”
স্থানীয়রা বলছেন, কাজল করের মতো আরও বহু মানুষ আছেন, যারা ২০-২৫ বছর আগে ভারতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও নাগরিকত্বের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ তাঁদের হাতে নেই। এই কারণে আজ তাঁরা চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
এক প্রতিবেশী বলেন, “কাজল আমাদের গ্রামের মেয়ে হয়েই গিয়েছে। ওর সন্তানরা এখানেই স্কুলে পড়ে। এখন যদি ওকে বাংলাদেশি বলা হয়, সেটা মানবিকতারও লঙ্ঘন।”
পূর্ব মেদিনীপুর প্রশাসনের এক আধিকারিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকভাবে জানান, “এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনেক পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান তথ্যের অমিল থাকছে। এই কারণে অনেক নিরীহ মানুষ আতঙ্কে ভুগছেন। বিষয়টি সরকারকে জানানো হচ্ছে।”

