দ্য মেদিনীপুর টাইমস প্রতিবেদন, মেদিনীপুর: স্ত্রী স্নেহা চক্রবর্তীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে চর্চায় উঠে এল বিএমডব্লিউ (BMW) গাড়ি কেনা নিয়ে দাম্পত্য কলহ এবং অভিযুক্তের বন্ধু বাশারের ভূমিকা। গাড়ি কেনার জন্য স্ত্রীর বাপের বাড়ির কাছে ১০ লক্ষ টাকা দাবি করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বামী রণদীপ জানার আইনজীবী। বুধবার মেদিনীপুর আদালতে তাঁর দাবি, রণদীপ নিজের টাকাতেই বিলাসবহুল গাড়িটি কিনেছিলেন। অন্যদিকে, স্নেহার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মেয়েকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।
গত ৮ অক্টোবর মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন যমুনাবালিতে শ্বশুরবাড়ি থেকে উদ্ধার হয় স্নেহার দেহ। এই ঘটনার পরের দিনই গ্রেপ্তার হন তাঁর স্বামী রণদীপ জানা এবং শ্বশুর রতন জানা। চার দিনের পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বুধবার রণদীপকে ফের মেদিনীপুর আদালতে হাজির করানো হয়। শুনানির পর বিচারক তাঁকে আরও চার দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। রতন জানা বর্তমানে জেল হেফাজতে রয়েছেন।
রণদীপের আইনজীবী মৃণাল চৌধুরীর দাবি, বিএমডব্লিউ কেনার জন্য স্নেহা বা তাঁর পরিবারের উপরে ১০ লক্ষ টাকা দেওয়ার কোনও চাপ তৈরি করেননি রণদীপ। আইনজীবীর বক্তব্য, বালি ব্যবসায়ী রণদীপ নিজের উপার্জনের টাকাতেই গাড়িটি কিনেছিলেন। তাঁর দাবি, স্নেহার পরিবারের দায়ের করা অভিযোগপত্রেও গাড়িটি রণদীপের নিজের টাকায় কেনার কথা উল্লেখ রয়েছে। আইনজীবী আরও জানান, রণদীপের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন ছাড়া আর কিছু বাজেয়াপ্ত করা হয়নি এবং ওই ফোন দুটির সঙ্গে মামলার সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এই সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়ি কেনা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ হয়েছিল বলে আদালতে দাবি করেছেন রণদীপের আইনজীবী। তাঁর বক্তব্য, গাড়িটি কেনা নিয়ে স্নেহার আপত্তি ছিল এবং তা থেকেই দু’জনের মধ্যে ঝগড়া হয়। এরপর স্নেহা আত্মহত্যা করেছেন বলে আদালতে দাবি করেন আইনজীবী। তবে এটি অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য; মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।
আদালত চত্বরে রণদীপের এক আত্মীয়েরও দাবি, রণদীপের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে এবং তিনি নিজের ইচ্ছায় টাকা খরচ করতে পারেন। স্নেহাকে উপহার দেওয়ার জন্যই বিএমডব্লিউ গাড়িটি কেনা হয়েছিল বলে দাবি করেন ওই আত্মীয়। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আদালতের বিচারেই প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।
অন্যদিকে, স্নেহার বাবা ধ্রুব চক্রবর্তীর অভিযোগ, বিয়ের সময় মেয়েকে প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকার গয়না দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, স্নেহা তাঁর মায়ের গয়নাও ব্যবহার করতেন, কিন্তু মৃত্যুর পর সেগুলিরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় সঠিক বিচার চেয়েছেন তিনি।
গত ৯ অক্টোবর স্নেহার পরিবারের তরফে থানায় জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছিল, ৭ অক্টোবর রাতে রণদীপ নতুন বিএমডব্লিউ গাড়ি বাড়িতে নিয়ে আসেন। গাড়ি কেনা নিয়ে স্নেহার আপত্তি ছিল বলে অভিযোগ। পরিবারের আরও দাবি, ওই রাতে বন্ধুদের সামনে স্নেহাকে অপমান ও মারধর করা হয়। রণদীপের বন্ধু বাশারও স্নেহাকে কুমন্তব্য করেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতেও স্নেহাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল বলে দাবি তাঁর বাপের বাড়ির লোকেদের। এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে, তাঁদের মধ্যে দু’জন ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। অভিযুক্ত রণদীপের মা, ভাই এবং বন্ধু বাশারের খোঁজ চলছে। তদন্তের প্রয়োজনে রণদীপকে ফের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্নেহার মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে পরিবারের নির্যাতন ও গয়না নিখোঁজের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের পাল্টা বক্তব্য—সব মিলিয়ে তদন্তে একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, গাড়ি কেনা নিয়ে বিরোধের প্রকৃতি এবং বাশার-সহ অন্যদের ভূমিকা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।





